২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির রাজ্যব্যাপী দেওয়াল লিখন অভিযানের অংশ হিসেবে ডিব্রুগড়ে আয়োজিত এক দলীয় কর্মসূচির ব্যানার থেকে সর্বানন্দ সনোয়ালের ছবি বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সনোয়াল অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, বর্তমান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং ডিব্রুগড়ের বর্তমান সাংসদ।
এই ঘটনাটি ঘটে ৫ জানুয়ারি ডিব্রুগড়ে । অথচ ডিব্রুগড় সনোয়ালের রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দলীয় ঐক্য ও তৃণমূল স্তরে সংগঠিত হওয়ার বার্তা তুলে ধরার কথা ছিল এই কর্মসূচির মাধ্যমে। কিন্তু তার বদলে ঘটনাটি হয়ে ওঠে উপেক্ষার এক স্পষ্ট উদাহরণ।
অসমের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সর্বানন্দ সনোয়াল—যিনি ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসে ২০১৬ সালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জানা গেছে, তাঁকে ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু তবুও প্রচারমূলক ব্যানারে তাঁর ছবি রহস্যজনকভাবে অনুপস্থিত ছিল।
এনিয়ে কমলেশ্বর নাথ নামের জনৈক বিজেপি কর্মী ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়, যেখানে তিনি জেলা নেতৃত্বকে কোনো রাখঢাক না করেই কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। ডিব্রুগড় জেলা বিজেপি সভাপতি দুলাল বরাকে উদ্দেশ করে লেখা এক তীব্র বার্তায় নাথ লেখেন—
“ডিব্রুগড় জেলা বিজেপি সভাপতি দুলাল বরাজী, অনুগ্রহ করে নিজের ছবির কপিটাও সংযুক্ত করতে ভুলবেন না। শ্রদ্ধেয় মহাশয়, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল কি বিনা আমন্ত্রণেই ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন? নাকি জেলা অফিসের কাছে তাঁর ছবি সম্বলিত ব্যানার ছাপানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না? এসব কী—অহংকার না মূর্খতা? এভাবে একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আপনাকে কে দিল? এর কোনো জবাব দিতে পারবেন কি? আপনার নিজের সাংসদ সর্বানন্দ সনোয়ালের সঙ্গে এমন আচরণ করে আপনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন? সর্বানন্দ সনোয়াল ক্ষমতার লোভী নন, আবার তিনি সম্মান পাওয়ার জন্যও মরিয়া নন। আপনি তাঁকে সম্মান না করলেও তাতে তাঁর কিছুই যায় আসে না। কিন্তু মানুষ অবশ্যই আপনাকে একজন মূর্খ জেলা সভাপতি হিসেবেই চিনবে। খুব বেশি সময় লাগবে না, সাধারণ মানুষের কাছে আপনার আসল চেহারা ধরা পড়তে।
আপনার মানসিকতা থেকে আমরা কী ধরে নেব? আপনি কি নিজের যোগ্যতায় এই পদ পেয়েছেন, নাকি কারও তোষামোদ করে? এই প্রশ্নটাই আজ সবার মনে উঠছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন সস্তা মানসিকতার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই জন্যই আমি শুধু সতর্ক করে দিলাম।”
তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত এক নেতা দুলাল বরাকে জেলা সভাপতির দায়িত্বে উন্নীত করার পর এখন তাঁর বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছে—তিনি দলীয় বর্ষীয়ান নেতাদের গুরুত্ব না দিয়ে আত্মপ্রচারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। এটি নিছক কোনো মুদ্রণজনিত ভুল নয়; বরং এটি একটি গভীর অসুস্থতার লক্ষণ—যেখানে যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদই বেশি প্রাধান্য পায়, আর স্থানীয় নেতারা সিনিয়র নেতৃত্বকে উপেক্ষা করে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করেন।
যে রাজ্যে সর্বানন্দ সনোয়ালের দুর্নীতিবিরোধী ও অনুপ্রবেশবিরোধী ভাবমূর্তির ওপর ভর করেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল, সেই রাজ্যেই তাঁর নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় তাঁকে কোণঠাসা করা কৃতজ্ঞতার অভাবের ইঙ্গিত দেয়, অথবা তার চেয়েও খারাপ—ইচ্ছাকৃত অন্তর্ঘাতের সন্দেহ জাগায়।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রশ্নের জবাবে দুলাল বরার নিষ্প্রভ ব্যাখ্যা ছিল—
“সর্বানন্দ সোনোয়ালকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।”
কমলেশ্বর নাথ যেভাবে ব্যঙ্গ করে ইঙ্গিত করেছিলেন, এটি কি তবে বাজেটের ভুল? নাকি আধিপত্য দেখানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত অপমান? নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বিজেপি কি ইচ্ছাকৃতভাবেই সোনোয়ালের প্রভাব খাটো করে দেখাতে চাইছে—নতুন মুখ বা প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর জন্য জায়গা করে দিতে? নাকি সবটাই জেলা সভাপতির অব্যবস্থাপনার ফল, যিনি ব্যানারটি সঠিকভাবে আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছেন?
অন্যদিকে, সর্বানন্দ সনোয়াল তাঁর অমুখর ও সংঘাত এড়িয়ে চলা নেতৃত্বের ভাবমূর্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবেই নীরবতা বজায় রেখেছেন। কিন্তু চিত্রটা (optics) অসমে বিজেপির জন্য নিঃসন্দেহে ভীষণ ক্ষতিকর।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বিপুল জয় পেলেও, সর্বানন্দ সনোয়াল সৌজন্যের সঙ্গে সরে দাঁড়ানোর পর হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন থেকে দলের ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্বের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। উজনী (উচ্চ) অসমের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন ডিব্রুগড় ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই সনোয়ালের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় তাঁকে উপেক্ষা করা হলে তার প্রভাব গোটা রাজ্যজুড়ে পড়তে পারে, যেখানে জাতিগত সংবেদনশীলতা ও নেতৃত্বের অহংকার প্রায়ই নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারণ করে।
২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে থাকায়, এই বিপর্যয় কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দলগুলোর মতো প্রতিপক্ষদের হাতে বড় অস্ত্র তুলে দিচ্ছে, যারা বিজেপিকে নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত একটি দল হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।